ভ্রমণকাহিনী | সাজেক ভ্যালী (Sajek Valley)


• আসিফ ওয়াহিদ

প্রকৃতির লীলাভূমি, সবুজায়ন আর সাদা মেঘের চাদরে লুকোচুড়ি কখনো গরমের ঘাম ঝড়া লোনা পানি কখনো আবার বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া প্রকৃতি নিয়েই আপনাকে বিমহিত করতে মহুর্ত্বেই সাজেক ভ্যালী ছন্দ পতন।
এক জায়গা থেকেই প্রতৃতির এত অপরুপ দৃশ্যর আবলোকন  ভ্রমন পিপাসুদের টানে এই সাজেক ভ্যালী।

তখন  রাত ১১ টা শরৎ কাল  একে একে সব বন্ধু এক সিদ্ধান্তে উপনিত হল এবার সবাই মিলে মেঘের রাজ্য সাজেকে টুর,  ডেট ফিক্সড করে আয়োজন শুরু হয়ে গেল।

বিভিন্ন জেলার বন্ধুরা সবাই ফেনীতে এক বন্ধুর বাড়ি উঠলাম। ফেনীর বন্ধু আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন আমরা একে একে  বিভিন্ন সময় ১১ জন বন্ধু ফেনীতে পৌছালাম সবাই মিলে রাতের খাবার শেষ করলাম  পরে গল্প করেই কেটে গেল রাত ১২ টা অবদি। সবাই সবার মত করে তৈরী হয়ে রাত ১ টায় মইপালের উদ্দ্যশে বের হলাম কারন গাড়ি রাত ২ টায়। ফেনীর বন্ধু অমিত আগে থেকেই আমাদের সবার জন্য ১২ টি টিকিট কেটে রেখেছে যা আমাদের ফেনী মইপাল থেকে খাগড়াছড়ি পৌছায় দেয়। খাগড়াছড়ি পৌছাতে পাহাড়ি রাস্তার আঁকাবাকা পথ ভ্রমনের ভিন্ন স্বাদ অনুভব করে দেয়। মাঝ পথে আমাদের গাড়ি  থামিয়ে ফযরের আযান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় এটা নিয়েমের মধ্যেই পড়ে। সে সময় সবাই গাড়ি থেকে নেমে চা খেতে বসি ছোট এক টি স্টলে। চা খেতেই ব্যতিক্রম কিছু একটা অনুভূতি দাঁতে চিবিয়ে খেতে হচ্ছে পরে লক্ষ করে দেখি সেটা চাল ভাজা। এখানকার চা এমনি। পরে  ফযর আযান হয়ে গেলে সব গাড়িকে যেতে অনুমতি দেয়। আমরা সকাল ৬ টায় খাগড়াছড়ি পৌছায় গেলাম।

খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক এর দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বরের  কাছ থেকে  চাঁন্দের গাড়ি দুই দিনে ১০,০০০ টাকা
রিজার্ভ নেই। গাড়ি রেডি হতে হতেই আমরা পাশেই সকালের নাশতাটা সেরে ফেলি।

নাশতা সেরে গাড়িতে সবাই বসে পড়লাম। ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল আমাদের আনন্দ যেন বার্তি মাত্রা যুক্ত হল। চাঁন্দের গাড়িতে প্রথমবারের মত জার্নি বেশ মজা লাগছে আমরা কিছু পথ গিয়েই অপেক্ষার শুরু করলাম। আর্মিদের সাথে ১০.৩০ টার এসকোর্টে যেতে হবে। আগে দিনের যেকোন সময় জীপ নিয়ে যাওয়া যেত। শান্তি বাহিনী আর্মির বিগ্রেডিয়ারে জীপে আগুন দেওয়ার পর নতুন নিয়ম হয়েছে। আর্মি এসকোর্ট ছাড়া কোন ট্যুরিস্ট জীপ যেতে দেওয়া হয় না। খুব বেশি ভীড় যেদিন হয় সেদিন ২০০টা পর্যন্ত জীপ একসাথে সাজেক যায়।  আজকে অনুমান করছি ১৫০ জীপ তো হবেই।

আর্মির এসকোর্ট গাড়ি আসলে এক লাইনে সব জীপ চলা শুরু করলো। এসকোর্টের একটা জীপ থাকে সবার সামনের, আরেকটা সবার পিছে। আমি সহ কয়েকজন বন্ধু জীপের ছাদে চলে গেলাম। কথিত আছে, সাজেক যেতে জীপের ছাদে না বসলে নাকি জার্নির আসল মজা পাওয়া যায় না। আমাদের সকল বন্ধু এক সঙ্গে গান ধরলাম। অমিত বাজনা করার জন্য হ্যন্ড ডোল সাথে এনেছে আমরা সবাই গান করছি অমিত তাল মিলিয়ে সেটা বাজাচ্ছে বেশ জমে উঠেছে হেলে দুলে পাহাড়ি রাস্তায়। হঠাৎ মাঝ পথে পাহাড়ী এক খাড়া ঢালে জীপের গিয়ার আটকে গেলো। এধরনের জীপের ব্রেক হয় মারাত্মক। জীপ থেমে গেলো, নিচের দিকে নামতে শুরু করল ড্রাইভার খুব সতর্কতার সাথে জীপ পিচন দিকেই নিচে নামলো। একটু নেমেই চাকার নিচে একটা কাঠের স্লিপ দিল (মোটা কাঠের গুড়িঁর মত যা চাকায় দিলে ব্রেকের কাজ করে)  হঠাৎ এমন ঘটনায় হৃৎপিন্ড যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।
ড্রাইভার বললো, কয়েকজনকে নামতে হবে। দ্রুত বেশ কয়েকজন বন্ধু নেমে পড়লাম। পরে আর আমরা জীপের ছাদে না বসে গাড়ির ভিতরেই সবাই বসে পড়লাম।  ড্রাইভার গিয়ার ঠিক করে চালাতে চালাতে বলছিলো, পাঁচ বছর হলো সাজেক রুটে গাড়ি চালায়, কখনো এমন হয় নাই। তবে মাঝে মাঝে অনেক ড্রাইভারের এমটা হয় শুনেছি। 

আমাদের গাড়ি বেশ ভালো ভাবেই চলছে রাস্তার দু'পাশে  দু'চোঁখ জুড়ানো পাহাড়ের সারি ছোট বড় অসংখ্য গাছ আর আদিবাসিদের বাড়ি।  তবে মজার ব্যপার হল একানকার ছোট ছেলে মেয়েরা সকল টুরিসদের হাত নাড়িয়ে অভিবাদন জানায়। মাঝে মাঝে খাড়া রাস্তায় জীপ গুলো একাই একাই উপরে উঠে। খাড়া ঢাল রাস্তা দেখলেই ভয় ভয় লাগতেছিলো তখন আদিবাসীরা তাদের বিভিন্ন ফল (কমলা, মালটা, পেঁপে, আখ ডাব, জাম্বুরা, কলা ইত্যাদি) নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। আমরা কলা আর জাম্বুরা খেয়েছিলাম আমাদের বাজার থেকে বেশ সস্থা দাম। আমরা পথি মধ্যে এক ঝুড়ি পাকা কলার কান্দা  গাছ ভেঙ্গে পড়া দেখে তা গাড়িতে উঠিয়ে নেই  সবাই কলা খেতে শুরু করে।
নানা যলপনা কল্পনা শেষ করে শেষ পর্যন্ত দুপুর ২টার দিকে  সুস্থভাবে সাজেক পৌঁছালাম। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে রুইলুই পাড়ার  ছোট এক আদিবাসী  কটেজে। আমরা কটেজে যাওয়ার আগেই দুপুর খাবার খেতে বসলাম। খাবার খেতে বসতেই গরম গরম ভাত, মুরগি, পাহাড়ী সবজি আর ডাল চলে আসলো। মুরগিতে অসম্ভব ঝাল ছিলো। পাহাড়ী মরিচ এমনিতেও অনেক ঝাল। আমার সমস্যা না হলেও বাকিদের বেশ কষ্ট হলো। খাওয়া শেষ সবাই আমরা  কটেজে চলে আসলাম। অতপর সবাই কটেজে গিয়ে ফ্রেস হলাম।

সাজেকের রুইলুই পাড়ার উচ্চতা ১৮০০ ফুট, আমাদের কটেজও এখানে। কটেজের বিপরীতে বিশাল এক গাছ, নিচে বসার ব্যবস্থা আছে। কিছু সময় পাহাড়ী বাতাস খেয়ে বের হলাম হেলিপ্যাডের উদ্দ্যেশে। হেলিপ্যাডে দাড়িয়ে সবাই মিলে সারি সারি  পাহাড়ের  সুন্দৌর্য্য অবলোকন করছি ছবি তুলছি সূর্যদয়ের  দারুনভাবে ইনজয় করলাম  এরি সাথে সাথে প্রকৃতি কালো অন্ধকারচ্ছন হতে থাকলো চাঁদের আলো যে এত মিষ্টি হতে পারে হেলিপ্যাডে না গেলে বুঝতাম না। রাতের আকাশের তারা যেন চোঁখ জুড়িয়ে দিল সবার। আকাশে বিশাল এক চাঁদ এবং সেই আলোয় পুরো হেলিপ্যাড আলোকিত। লাইন ধরে সবাই বসে পড়লাম। এখন হবে চন্দ্রস্নান।
হঠাৎ কিছুক্ষের মধ্যেই মেঘের চাদোরে মুড়িয়ে নিল সাজেকের হেলিপ্যাড। হালকা বাতাস বয়ে চলছে ঠান্ডা অনুভব হতেই আমরা কটেজের দিকে রহনা হলাম আমরা কটেজে পৌছানোর আগেই হঠাৎ বৃষ্টি নামতে শুরু করল। সবাই একটা খাবার হোটেলে উঠে পড়লাম চা আর খালি গলায় গানের আসর জমে উঠেছে বৃষ্টির তালে তালে। তখন রাত ৯ টা সবাই চিন্তা করলাম রাতের খাবারটা শেষ করেই কটেজে যাই পরে সাজেকের ঐতিয্যবাহী খাবার বেম্বু চিকেন অডার করা হল দারুন তৃপ্তি সহকারে সবাই খাবার শেষ করল। বৃষ্টি তখন থেমে গেছে।
আরো পড়ুন -->>

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ